পকেটমারের বউ

0
1934

ছবি বাঁ- হাতের বুড়ো আঙুলের নখের মধ্যে পেট মোটা উকুনটাকে রেখে ডান হাতের আঙুলের চাপে,’পুট’ করে মেরে আবার মাথার চুলে ব্যাস্ত হাতে উকুন খুঁজতে লাগলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছিল না। বুড়ো মানে ওর বর, (ভালোনাম কখনো স্বপন ছিলো)এখনো বাড়ী ফেরেনি। ঘরে অল্প একটু চাল আছে,কিন্তু না আছে কেরোসিন না কয়লা, ঘুঁটে।আজ এতো বেলা হল বুড়ো বাড়ী ফেরেনি।এই হদ্দ গ্রামে কাজ জোটেনা। একটা ছোট ঘর ভাগে পেয়েছে; ওর শ্বশুর এই একটাই বুদ্ধিমানের মত কাজ করেছিল, এই বাড়ী বানিয়ে। সামনে দু’কাঠা মত জমি আছে,দাম পেলে বেচে দু’ভাই নেবে। শ্বশুর বাড়ীতে ভাসুর, জা সব আছে, যা নেই তা টাকা।
ছবি বুড়োর দ্বিতীয় পক্ষ। প্রথম বউ খেতে না পেয়ে পাশের গ্রামের নিতাইএর সাথে চলে গেছে। নিতাই ছুতোরের কাজ জানে, ভালোই রোজগার।বুড়োর জন্ম থেকে একটা কান নেই। বড় চুলে অমিতাভ বচ্চনের সাতের দশকের হেয়ার কাট। ছুঁচোর মত মুখ, হলদে দাঁত, কাঠির মত চেহারা।পাড়ার লোকে ‘কানকাটা’ বলে ডাকে। ও সাড়া দেয়। কানকাটা নাম হলেও আসল কাজ পকেটকাটা। ইচ্ছে করে তো এই রাস্তায় আসে না।লেখাপড়া শেখেনি, হাতের কাজ ও কিছু শিখতে চায়নি। তাই পকেটমার। এ লাইনে কামাই আছে কিন্তু ধরা পরলে পাবলিকের মারে অনেকেই মরে যায়। বুড়ো দু-একবার ধরা পরেও মরেনি কারন চেহারা।এতো রোগা যে আরামে পালাতে পেরেছে।
এই গল্পের সময় ছিয়াশি সাল।কিছুদিন আগেই বউ ভেগেছে, বুড়ো আরামে ছবিকে নিয়ে ঘরে চলে এসেছে।ছবির খুব বুদ্ধি, নাইন অবধি পরেছে। বুড়ো পকেটমার জেনেও কোন ন্যাকামী করেনি। গরীব মানুষ কাজ না করলে চুরি করবে। এই শাপলাপুর চাষীদের গ্রাম। কয়েকঘর চাকরিজীবি আছে, তবে তারা নিজেদের নিয়ে ব্যাস্ত।জা এর কাছে একটু কেরোসিন চাইবে কি? বড় মুখ! মেজাজ খারাপ থাকলে গুষ্টি উদ্ধার করে দেবে।কিন্তু বুড়োর আশায় কতক্ষন থাকবে?
-দিদি, একটু কেরাসিন দেবে? তোমার দেওর আসলে দিয়ে দেবো।
– উঁ কে আমার সাত গুষ্টির বোন এলোরে! কেরাসিনের বোতল নিয়ে বসে আছি।
-একটু ভাত বানাবো। দাও না গো।
-চৌকির নিচে আছে নিয়ে যা। আর শোন, বুড়ো আসলেই ফেরত দিবি।
– ও এলেই বিশের দোকান থেকে নিজে কিনে এনে দেবো।
ষ্টোভে ভাত বসিয়ে ছবি চট করে টিউবয়েলে গিয়ে স্নান করে আসে। গরম গরম ভাত, শুধু নুন দিয়েই খেয়ে ফেলে।পেটে ভাত যাওয়ায় একটু আরাম লাগে। ছবি বাড়ীর থেকে বেড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়, বুড়ো আসলে এখান থেকে চোখে পরবে।এমন সময় দেখে রথীন বাবুর বউ মানসী বৌদি যাচ্ছে ওনার বাড়ির দিকে। এনার স্বামী চাকরী করলেও বউটার দেমাক নেই। সবার সাথে হেসে কথা বলে। ছবি কে দেখে হেসে বললেন,’এখানে দাঁড়িয়ে বরের জন্য অপেক্ষা করছো না কী, ছবি?’
-‘হ্যাঁ! বউদি দেখুন না এখনো ফেরেনি, চিন্তা হয়না?’
-‘চিন্তা হবেই। কিন্তু কী করবে, পুরুষ মানুষ বাড়ীর বাইরে গেলে সবার আগে ঘরের কথা ভুলে যায়। তা তোমার দুপুরের খাওয়া হয়েছে?’
-‘ঘরে ঘি, ডিম ছিলো। ঐ ডিম সেদ্ধ, ঘি দিয়ে মেখে ভাত খেয়েছি।‘
মানসী ভালো করেই জানে ঘি, ডিম ছবির স্বপ্নের ব্যাপার; তবু কিছু বলেন না।আহা! মেয়েটা অভাবে মরে গেলেও কখনো বরের অসম্মান হয় এমন কিছুই বলে না।
-‘আমি যাই ছবি।‘ বলে মানসী ঘরের দিকে এগোয়।
সেদিন সন্ধ্যায় বুড়ো একটা ছোট ব্রিফকেস নিয়ে ফেরে।
-‘স্নান করছি, ততক্ষন ভাত বেরে ফ্যাল ছবি।‘ বুড়ো বলে।
-‘চাল বাড়ন্ত।‘
-এখন আমি চাল কোথা থেকে আনবো? তুই বউদি র ঘর থেকে ধার করে আন, কাল সকালে কিনে আনলে দিয়ে দেবো।‘
-‘ দিদি দেবেনা। মিছে গাল খেয়ে মরবো আমি। তুমি যাও না বিশের দোকানে।‘
-‘বিশে আমার কোন সুমুন্দি লাগে যে মাগনা দেবে?’
-‘ মাগনা কেন? কিছু আনোনি?’
-‘ঐ বাস্ক খুলে দেখিনি। বেশ ভারী। এক বুড়ো ট্রেনে উঠে ভিড়ের জন্য দাঁড়াতে পারছিলো না। বাস্কের গুঁতোয় অন্য রা বিরক্ত হচ্ছিলো। তাই উপরে রেখেছিলো। আমি নিয়ে নেমে পরেছি। জানিনা কী আছে!’
-‘তাইলে খোল। দেখি কি আছে?’
-কেরোসিনের অভাবে হ্যারিকেনটাও নিভু নিভু অবস্থা। বুড়ো একটা স্ক্রু আর ছোট হাতুড়ি এনে ভেঙ্গে ফেলে ব্রিফকেসের ডালা।আর দু জনেই অবাক হয়ে যায়। পঞ্চাশ আর একশোটাকার বান্ডিল ভর্তি! আনন্দে পাগল হওয়ার অবস্থা বুড়োর। ছবি কিন্তু খুশি হতে পারে না।ভালো করে দেখতেই ব্রিফকেসের টাকা্র গোছার নিচে বিয়ের কার্ড পায়। চাকদহর কোন এক অমর সরকারের মেজো মেয়ের বিয়ে হচ্ছে হালিশহরের চৈতন্য বিশ্বাসের ছোট ছেলের সাথে।
-‘বুড়োটা কোত্থেকে উঠেছিলো ট্রেনে?’
-‘কল্যানী থেকেই বোধহয়। তুই অত জেনে কি করবি?’
-‘লোকটা নিশ্চই মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা নিয়ে যাচ্ছিলো। মেয়ের বিয়ের টাকা। ও আমি মরে গেলেও নেবো না।‘
বুড়োর মাথা গরম হয়ে যায়।
-‘তাহলে কী করবি, ফেরত দিতে যাবি নাকী?’
-‘হ্যাঁ! ফেরত দেবো।‘
-‘ইহি রে! ফেরত দেবে। তোর বাপের টাকা?’
ছবির মনে পরে নিজের গল্প। ওর বাবাও অনেক কষ্ট করে ওর বিয়ে ঠিক করেছিলো এক রাজমিস্ত্রির সাথে। জমানো কিছু টাকা নিয়ে ফেরার পথে সেই টাকা চুরি হয়ে যাওয়ায় বিয়ে ভেঙে যায়। তারপরে অনেক অপমানের ভাত খেয়ে আজ ও বুড়োর সাথে ঘর বেঁধেছে। আজ এই টাকা নিলে ঐ মেয়েটার জীবনে না জানি ওর মত কত অপমান নেমে আসবে। ছবি সামান্য পড়া শোনা জানা, গরীব, পকেটমারের বউ হতে পারে, কিন্তু জেনে শুনে অন্য একটা মেয়েকে আরেকজন ছবি বানাতে পারেনা।
ছবির জিদের কাছে হার মেনে পরের দিন বুড়ো আর ছবি ঠিকানা খুঁজে চাকদহ তে অমর সরকারের বাড়ী যায়। সেই বাড়ীতে তখন শোকের পরিবেশ।ছবি জিজ্ঞাসা করে,’এটা কী অমর বাবুর বাড়ী?’
একটা শ্যামলা গায়ের, বিষাদ মাখানো চোখের মেয়ে বলে, ‘ওনার ই বাড়ী। আপনাদের কি দরকার যদি বলেন?’
ছবি মেয়েলি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের কৃপায় বুঝতে পারে, এই মেয়েটার ই বিয়ে।
-‘ আপনার বাবার টাকার বাক্স আমার স্বামী নিজের মনে করে ভুল করে নিয়ে কাল নেমে গেছিলেন। দেখুন তো এই বাক্সটাই কি না? কিছু মনে করবেন না। আপনাদের ঠিকানার আশায় বাক্সটা ভাঙতে হয়েছে।‘
মেয়েটির মুখে মুহূর্তে হাসি, কান্নার ছায়া একসাথে খেলে যায়। তারপরেই ও ছবির হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে ডাকে, ‘বাবা! মা! বাইরে এসে দ্যাখো কারা এসেছে?’
ঘরের ভিতর থেকে এক বয়স্ক ভদ্রলোক আর ভদ্র মহিলা সাথে দু-একটা ছেলে মেয়ে বেড়িয়ে আসে।ওনারা সব শুনেও বিশ্বাস করতে পারেন না, কেউ হাতে পেয়েও এতো টাকা ফেরত দিতে আসে বাড়ী বয়ে।ভদ্রলোক, ওদের মিষ্টি খাওয়ায়। বারবার করে মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রন করেন।
ফেরার সময় বুড়ো আর ছবি মাথা উঁচু করে হাঁটতে থাকে। জীবনে প্রথমবার।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে