ফিরে আসা

0
764

সকালে ঘর থেকে বেরবার আগে দেয়ালে চিপকানো লেখাগুলোর দিকে আবার একবার তাকিয়ে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিলো অজিত, ওদিক থেকে ভাই তাড়া দিচ্ছে, “কীরে দাদা? কখন বেরোবি? দশটা থেকে তো এক্সাম, সাড়ে আটটাতে ঢুকতে হবে, স্লট জানিয়ে দিয়েছে তো ।”
লেখাগুলো দেখতে দেখতে কোথায় হারিয়ে গেছিলো অজিত, ভাইয়ের কথা শুনে কিছুটা থতমত খেয়েই বললো, “হ্যাঁরে, আমি তো রেডিই, চল, বেরোচ্ছি এবারে ।”
ঘর থেকে বেরিয়ে বাস, অটো করে একঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলো ওরা, পরীক্ষাহলে ঢোকার আগে সুজিত বললো আবার, “দাদা, অল দ্যা বেস্ট ।”
ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা হাল্কা হাসি হেসে ভেতরে ঢুকে গেলো অজিত, গার্ডরা চেক করার পর এক্সাম হলে ঢুকতে দিলো ওকে, ভেতরে ঢুকে আবার টেনশানটা হতে শুরু করলো ওর, যেমন আগে হতো, হাজার হলেও একটা অলইন্ডিয়া এক্সাম বলে কথা । দশটা অবধি বসে হাতে কোয়েশ্চেন পেপার পেলো অজিত, প্রথমদিকে নার্ভাস লাগলেও, আস্তে আস্তে সড়গড় হতে লাগলো ও, একটার পর একটা প্রশ্ন সল্ভ করতে করতে ওপর থেকে নীচের দিকে নেমে আসতে থাকলো ।

পরীক্ষাটা হয়ে একমাস মতন হয়ে গেছে, আজকে রেসাল্ট বেরোবার দিন, এতদিনের মধ্যে কারোর সাথে একবারের জন্যও দেখা করেনি ও, দেখা করেই বা কি হবে, কেউই তো কথা শোনাতে, ছোট করতে ছাড়েনা, যার অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার এরকম, তাকে তো কথা শুনতেই হবে, কিছু করার নেই, তবে এটাই ওর শেষ বছর, এবারে নাহলে ও নিজেই ঠিক করে নিয়েছে কারাখানাতে গিয়ে কাজ করবে দরকার হলে, কিন্তু লোকের থেকে আর বেকার কথাটা শুনবেনা ও । সকালের দিকে সার্ভারে চাপ থাকে বলে আর দেখেনি অজিত, বিকালেই দেখবে ঠিক করলো, কিন্তু দুপুরে ওর এতদিনের কেমিস্ট্রি স্যার তমালবাবু ফোন করে ওকে ডাকতে প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারেনি ও, ওই দুপুরেই স্যারের বাড়িতে গিয়ে প্রথম খবরটা জানতে পারলো ও, স্যারকে রোল আর ফর্মনাম্বার বলা ছিলো, স্যার আগেই ওর রেসাল্টটা দেখেছেন, খুব ভালো না হলেও অলইন্ডিয়া মেডিক্যাল এনট্রান্সে পাঁচশো পঁয়ত্রিশ র‍্যাঙ্ক হয়েছে ওর, খুশিতে স্যার আর ওর দুজনেরই চোখে জল এসে গেছিলো, বিকাল থেকে সবাই ফোন করেছে ওকে রেসাল্ট জানতে, আবার অনেক বন্ধু ফোন করেছে, এরকম একটা ডাল মাথা কি করে এতো ভালো রেসাল্ট করলো, যেটা ওরা কেউই করতে পারেনি । কারোর ফোনই তোলেনি অজিত, শুধু ঘরে চুপচাপ বসে ঘটনাগুলো ভাবছিলো ও, মাধ্যমিক পর্যন্ত দারুণ রেসাল্ট, সাতশো তে ছশোপঞ্চান্ন, ইলেভেনেও ভালো পড়াশোনা চলছিলো, টুয়েল্ভেও তাই, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের আগে বাবার হার্ট অ্যাটাকে চলে যাওয়া, ওকে পুরো শেষ করে দিয়ে গেছিলো, এক ধাক্কায় ঠিক কোথায় হারিয়ে গেছিলো ও, সেটা ওর নিজেরও আজকে আর মনে নেই । শুধু মনে আছে উচ্চমাধ্যমিকে পাঁচশোতে তিনশোর ঘরে নাম্বার, যেখানে সবাই পেয়েছিলো চারশো, সাড়ে চারশো, চারশো আশি এরকম নাম্বার, তারপর ওর নিজের, মা, বাবার এতদিনের স্বপ্ন জয়েন্টে বসে একটা ভালো পজিশান অধিকার করা, কিছুই হয়নি, এতোটাই ভেঙ্গে পড়েছিলো ও, যে শুধু সেই বছরটা না, তার পরেরবছরও কিছুই করতে পারেনি ও, ওর সমস্ত বন্ধুরা একটা একটা করে লাইনে চলে গেছিলো, ওর সাথে কারোর দেখা হলেই সবাই হাসাহাসি করতো, “কোথা থেকে এলো রে এই মালটা? কে এটা?” আস্তে আস্তে সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলো অজিত, কাউকেউ আর ভালো লাগতোনা ওর, সবটা হয়ত শেষই হয়ে যেতো, সেদিন যদি ওর মা আর ওর ভাই পাশে না থাকতো, ওকে সাহস না দিতো, আজকে এই জায়গাতে ও থাকতে পারতোনা ।

প্রথমে ভেবেছিলো দেয়ালে চিপকানো লেখাগুলো ও খুলে ফেলে দেবে এবারে, তারপর ভাবলো, না থাক, এরাই তো শক্তি দিয়েছে ওকে কামব্যাক করতে, সবার করা ক্রিটিসাইজগুলো যদি ও না লিখে রেখে রোজ চোখের সামনে ফেলে না দেখতো, তাহলে ওর পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব = কোনোদিনই, ক্রিটিসাইজই অনেকক্ষেত্রে দারুণভাবে কামব্যাক করতে হেল্প করে, সেটা আজকে উপলব্ধি করতে পেরেছে অজিত, আর পিছিয়ে পড়বেনা ও কোনোদিন ।।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে